পরিকল্পনা ও সৃষ্টিশীলতা যার ছায়ার সাথী

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী: উন্নয়ন ও পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিতি ঘটেছে বেশ আগে। উৎপাদন ও উন্নয়ন অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। উন্নয়নের উপকরণগুলো সম্পর্কেও কিছুটা ধারণা হয়েছে স্কুলে সমাজবিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে। লক্ষ করেছিলাম যে, কেউ কেউ বলছেন, উৎপাদনের উপকরণগুলো হলো ভূমি, শ্রম, পুঁজি ও সাংগঠনিক দক্ষতা আর কেউ বলছেন উৎপাদনের উপাদানগুলো হচ্ছে স্রেফ ভূমি আর শ্রম। বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখেছি এবং বিশেষত যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে অভূতপূর্ব উন্নয়নের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন তখন নতুন করে উপলব্ধি করেছি যে উপাদান ও উন্নয়নের আরও দুটো আবশ্যকীয় উপাদান হচ্ছে প্রবল আত্মবিশ্বাস ও দেশাত্মবোধ।

একসময় পরিকল্পনা শব্দটির সঙ্গেও পরিচিতি ঘটে। কিছু করার পূর্বাহ্নিক সিদ্ধান্তকে পরিকল্পনা বলে সংজ্ঞায়িত করা যায়। পরিকল্পনা স্বল্পমেয়াদে, মধ্যমেয়াদে ও দীর্ঘমেয়াদে হতে পারে। ব্যষ্টিক বা সামষ্টিক ক্ষেত্রে সফলতার জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের প্রয়োজনে উপরিউক্ত ছয়টি উপকরণ ছায়াসঙ্গী। পরিকল্পনা শব্দটি নিয়ে তামাশা ভরা কথা শুনেছি। পরিকল্পনা মানে হচ্ছে ‘পরী’ ও কল্পনার সমাহার এবং পরী যখন আকাশে উড়ে যায় তখন থাকে মাত্র কল্পনা। এ বাস্তবতা-বিবর্জিত উক্তিটি সত্যেই আমাদের ব্যক্তিক জীবনেও গভীর দাগ কেটেছে এবং পরিকল্পনা যে পরী ও কল্পনার সমাহার নয় তার প্রমাণ রেখেছেন শেখ হাসিনা, তার সুদীর্ঘ শাসনামলের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীরা, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা, সচিব ও কর্মকর্তা, কর্মচারীরা।

বিগত বছরগুলোতে আমলাদের অনেকেই আমাদের দৃষ্টি কেড়েছেন যাদের ছিল যথার্থ শিক্ষা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবোধ, অন্তর্দৃষ্টি, বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি ও অনন্ত মানবপ্রীতি। ড. শামসুল আলম তাদের অন্যতম। শামসুল আলমের সঞ্চয়েও আছে শিক্ষা, দীক্ষা, বিজ্ঞান ও দেশপ্রেম; আর তা তিনি নিয়োগ করেছেন মানবকল্যাণে। তিনি শিক্ষকতার গ-ি ছেড়ে এসেছেন পরিকল্পনা কমিশনে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির কোটায় হয়েছেন আমলা আর আমলা থেকে সিনিয়র সচিব কাম পরিকল্পনাবিদ। এটা আমার কাছে লোভনীয় ব্যাপার ছিল। এই লোভনীয় পদে তার বহুদিনের অবস্থান তাকে শুধু গৌরবান্বিত করেনি, তিনিও তার পদ ও দায়িত্বকে দিয়েছেন এক মহিমাময় নতুন তাৎপর্য। সম্ভবত সে কারণে তিনি এ পদে রয়ে গেছেন বহুদিন। নিরলস পরিশ্রম করেছে। ক্লান্তি ও শ্রান্তিকে অবহেলা করেছেন।

সাম্প্রতিক কালে করোনা তাকে কাবু করেছে ঠিকই কিন্তু শতবর্ষী ডেল্টা পরিকল্পনার এখনো তিনি প্রাণপুরুষ। চাকরির পুরো মেয়াদ হলো ৪৪ বছর, চাকরি করেছেন খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ইউএনডিপি ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সফলতা ও নামডাক সর্বত্র। কারণ মানুষটি অতি মেধাবী। তিনি উচ্চ মাধ্যমিক ১৯৬৫ সালে পাস করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, যখন অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে মেধাবী সে পথ মাড়াত না। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি কৃষি অর্থনীতি (সম্মান) পাস করে তিনি এমএসসি ডিগ্রিও লাভ করেছেন। কৃষি অর্থনীতি বিষয়ে এই দুটো ডিগ্রি নিয়ে তিনি শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন। তারপর থাইল্যান্ড ও ইংল্যান্ড থেকে অর্থনীতিতে যথাক্রমে এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ৩৫ বছরের শিক্ষকতা ও শিক্ষা প্রশাসন ছেড়ে যোগ দিলেন প্ল্যানিং কমিশনে। তবে শিক্ষার সম্পৃক্ততা তিনি ছাড়েননি; বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বা রিজেন্সি বোর্ডের সদস্যপদে তার অধিষ্ঠান এর স্বাক্ষর বহন করছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন দক্ষ গবেষক ও প্রজ্ঞাবান লেখক হিসেবে। বস্তুত একদিন তার লেখা দিয়েই তার সঙ্গে পরিচিতিটা গভীর হতে থাকে এবং জানতে পারি মুক্তিযুদ্ধেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। সেটা ছিল সামষ্টিক মঙ্গল প্রত্যাশায় ও এবারের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রত্যাশা তাকে কৃষি অর্থনীতি থেকে সার্বিক অর্থনীতির জগতে ঠেলে দিয়েছে।

আরও জানতে পারি তিনি একজন সুবক্তা, ভালো উপস্থাপক। তার প্রমাণ মিলেছে যখন তাকে অতিথি বক্তা হিসেবে ওয়ার্ন্ড ইউনিভার্সিটিতে এনেছিলাম। তার পাণ্ডিত্য, দূরদর্শিতা ও দক্ষতার সঙ্গে আমাদের সম্যক পরিচিতি ঘটে। তার মতো মানুষের সমাগম ঘটেছে বলেই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এত সমৃদ্ধ, এত সুন্দরভাবে তার বার্ষিক পরিকল্পনা, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র, বদ্বীপ পরিকল্পনা বা শতবর্ষী পরিকল্পনার মতো চ্যালেঞ্জিং কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে। বয়সের হিসেবে তিনি আমার চার বছরের জুনিয়র। তারুণ্য এখনো তাকে ঘিরে আছে। দুর্বিনীত ও অনাহুত অতিথি করোনা তাকে খানিকটা ম্রিয়মান করেছে হয়তো কিন্তু আমার বিশ্বাস এই দুরন্ত, দূর্দম ও শক্তিমান মানুষটি আবারও তার তারুণ্য নিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো পাখা মেলবেন। জীবনের প্রারম্ভে দিয়েছেন বেশি, পেয়েছেন কম, মধ্যগগনে ঠিকই প্রচুর কিরণ ছড়িয়েছেন, এমনকি পড়ন্ত বেলায়ও দেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে। ক্ষেত্র বদলে যেতে পারে; হতে পারে রাজনীতি।

চাঁদপুরের এই তরুণটি এলাকায় বিশেষভাবে পরিচিত। একুশের পদকসহ আরও অনেক স্বীকৃতি ও সম্মাননা তার পরিচিতির ভিত্তি প্রশস্ত করেছে। এই জীবনকে রাজনৈতিকের জীবনে রূপান্তর হয়তো অসম্ভবও না। তার নিজ এলাকায় জনপ্রিয়তা ছাড়াও সুখ্যাতি আছে বৃদ্ধিজীবী মহলে, গ্রহণযোগ্যতা আছে আন্তর্জীতিক পরিম-লে। মনে হচ্ছে শেষ গন্তব্যও তার নাগালের কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে। সিনিয়র সচিবের পদ চিরকালীন নয়, তবে পরিকল্পনাবিদের কল্পনার জাল বোনার দিন ফুরাবে না; ফুরাবে না ভার সৃজনশীল লেখালেখি, গবেষণা ও প্রকাশনার তাগিদ ও বহর। প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ তালিকার কলেবরও বাড়বে। হয়তো একটা আত্যজীবনীও উত্তর প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় উপহার হয়ে থাকবে। কামনা করি তিনি দীর্ঘজীবী হোন।

লেখক: অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, সুদক্ষ শিক্ষা প্রশাসক ও সমাজ পরিবর্তনের লড়াকু সৈনিক।