তেজগাঁওয়ের নতুন ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকারকে তেজগাঁও বিভাগের ডিসি পদে পদায়ন করা হয়েছে। সোমবার ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এ পদে পদায়নের আগে বিপ্লব কুমার সরকার রংপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ছিলেন। গত ১৮ অক্টোবর তাকে ডিএমপিতে বদলি করা হয়। তারও আগে বিপ্লব কুমার ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগেরই ডিসি পদে ছিলেন।

এর আগে রংপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সময়টা খুব বেশি দিনের নয়, মাত্র ২৮ মাস। মানে ২ বছর ৪ মাসের কাছাকাছি। এই অল্প সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি করে গেছেন মানবিক কাজ। ভালো কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন মানুষকে। সবার মনে নাড়া দেওয়া এ মানুষটি দ্রুত বিস্তার করেছেন মানুষের মনে। সবার সঙ্গে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব। কিন্তু এ মানুষটির বিদায়বেলায় কার ভালো লাগবে? তাই অনেকেই কেঁদেছেন নিভৃতে। কেউবা ফুলের পাপড়ি ছিটানোর আড়ালে মুছেছেন অশ্রু।

৩ নভেম্বর রংপুর থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি। আগের দিন তাকে দেওয়া হয় বিদায়ী সংবর্ধনা। বর্তমানে বিপ্লব কুমার সরকারের কর্মস্থল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে। এর আগে গত ১৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জননিরাপত্তা বিভাগের এক সংবাদ প্রজ্ঞাপনে বিপ্লব কুমার সরকারসহ পুলিশ সুপার পদমর্যাদার সাতজনকে বদলি করার তথ্য জানানো হয়।

দৃশ্যমান উন্নয়ন ও এসপি বিপ্লব কুমার
বিপ্লব কুমার রংপুর জেলার দায়িত্ব গ্রহণের পর জেলা পুলিশ বিভাগে বেশ কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন করেছেন। যা রংপুরের মানুষের নজর কেড়েছে। এর মধ্যে রংপুর পুলিশ লাইনসের আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও দৃষ্টিনন্দন ফটক নির্মাণ অন্যতম। এ ছাড়া পুলিশ লাইনসে আধুনিক মসজিদ নির্মাণ, পুলিশ হাসপাতাল নির্মাণে অগ্রগতি, সাবস্টেশন নির্মাণ, জেনারেটর স্থাপন, পুলিশ লাইনস অডিটরিয়ামের আধুনিকায়ন। পাশাপাশি রংপুর পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজে শহীদ মিনার নির্মাণ, একাডেমিক ভবন সম্প্রসারণ, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল সংবলিত দৃষ্টিনন্দন ফটক নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। পুলিশ সুপার কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার স্থাপন তার সময়ে হয়।

একজন মানবিক পুলিশ সুপার
রংপুরে পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদানের পর থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি যেভাবে মানবিক কাজ করেছেন, তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অতীতেও অনেক ভালো কাজ হয়েছে। তবে বিপ্লব কুমার সরকারের মতো কেউ সাধারণ মানুষের হৃদয়কে সাড়া ও নাড়া পাননি।

বিপ্লব কুমার সরকার সব সময় নারী ফুটবলারদের পাশে ছিলেন। করোনা মহামারির শুরু থেকে তিনি ছুটেছেন সচেতনতার বার্তা নিয়ে। দরিদ্র ও অভাবী মানুষের জন্য বাড়িয়েছেন সহায়তার হাত। শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, এতিম, দুঃখী, মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতি ছিল তার সুদৃষ্টি, তাদের মুখে ফুটিয়েছেন হাসি। শিশু-কিশোর থেকে তরুণ-তরুণী, যুব-যুবাদের তিনি ভালো কাজে যেমন উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাই তিনি তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণা ও আশীর্বাদ।

ভ্যানচালক অসুস্থ বাবার মেয়েকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন বিপ্লব কুমার। বেশ কিছু অসুস্থ, এতিম, অনাথ ও দুস্থ পরিবারের শিশুর চিকিৎসার ব্যয়ভার নিয়েছেন। পবিত্র রমজানে আলুসেদ্ধ খেয়ে রোজা রাখা নুরুন্নবীর জন্য খাবার পাঠিয়েছেন। গোয়ালঘরে থাকা বৃদ্ধা মাকে নতুন ঘর করে দিয়েছেন। খবরের ফেরিওয়ালা শারীরিক প্রতিবন্ধী হকার জাহাঙ্গীরকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, তার সহযোগিতায় করোনাকালে ঢাকা থেকে রংপুরে চলে আসা আলসার রোগে আক্রান্ত রিকশাচালক আলমগীর ফিরে পেয়েছেন হারানো ঘর-সংসার। বৃদ্ধা ফেলানি বেওয়া, নিঃসঙ্গ মহিতনসহ শত শত এতিম শিশু, নিরীহ নুরুন্নবীসহ অসংখ্য মানুষের হাসির নাম যেন বিপ্লব কুমার সরকার। তার মানবিক কাজ ও মানবিকতা, আন্তরিকতা মুগ্ধ করেছে রংপুরের মানুষকে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তার অর্জন
দায়িত্ব গ্রহণের পর বিপ্লব কুমার প্রথমবারের মতো প্রতিটি থানায় গিয়ে অপরাধ প্রতিরোধে করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা করেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতি হয়। জনগণ ও পুলিশের মধ্যে সেবার সম্পর্ক গড়তে ছুটেছেন বিভিন্ন স্থানে। কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিটি থানায় বিট পুলিশিং কার্যক্রমে গতিসঞ্চারে ভূমিকা রাখেন। মাদকের বিস্তার রোধে এবং মাদক কারবারিদের ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ নিতে তার ভূমিকা ছিল জোরালো।

এসপি বিপ্লব কুমার সরকার দায়িত্বে থাকাকালীন রংপুর জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় কমে আসে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণসহ হত্যার ঘটনা। অপরাধ দমন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অনেক সাফল্য রয়েছে জেলা পুলিশের। আলোচিত কলেজছাত্রী রুখিয়া রাউথ হত্যার রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেফতার, বিয়ের দিনে কনেকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার ঘটনায় আসামিকে গ্রেফতার, নৈশ্যপ্রহরী হত্যার রহস্য উদঘাটন ও অপরাধীদের গ্রেফতার, ছিনতাইয়ের চার ঘণ্টার মধ্যে ইজিবাইক উদ্ধারসহ অনেক ক্লুলেস ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও আত্মগোপনে থাকা অপরাধীদের গ্রেফতারে সক্ষম হয় জেলা পুলিশ।

সবশেষ পীরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সহিসংতার ঘটনার অন্যতম হোতাসহ ধর্মীয় উসকানি ছড়ানোর হিন্দু ও মুসলিম দুজন যুবকও গ্রেফতার হয়।

তিনি দায়িত্ব নিয়ে এক টানা চারবার শ্রেষ্ঠ জেলা পুলিশ সুপারের সম্মানে পুরস্কৃত হন। এরপর ভরতে থাকে তার পুরস্কারের ঝুলি। গত ২৮ মাসে রংপুরে তিনি ছয়বার শ্রেষ্ঠত্বের সম্মাননা গ্রহণ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন থেকে তাকে পদক ও সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। বিদায়বেলায়ও তিনি বহু মানুষের ভালোবাসার উপহারে সমাদৃত হন।

বিপ্লব কুমার সরকার ২০১৩ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাসহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অবদান রেখে রেকর্ড সংখ্যক ২৩ বার শ্রেষ্ঠ উপকমিশনার (ডিসি) হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়ে তেজগাঁও বিভাগ পুলিশকে পরিচালনায় উপকমিশনারের (ডিসি) দায়িত্ব পালন করে প্রায় নিয়মিত শ্রেষ্ঠ ডিসির পুরস্কার জিতেছেন বিপ্লব কুমার সরকার। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দুবার পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম ও একবার পিপিএম পেয়েছেন। এর মধ্যে তিনি ২০১৪ সালে পিপিএম, ২০১৬ সালে বিপিএম এবং ২০১৮ সালে তিনি আবারও বিপিএম পদক পেয়েছেন।