জলবায়ু সম্মেলন: ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো পায়নি কর্মপরিকল্পনা, পেয়েছে অর্থ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি

শাহনাজ পারভীন এলিস: যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলন (কপ-২৬) থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো বিশেষ অর্থ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি পেলেও পায়নি সংকট সমাধানে টেকসই কর্মপরিকল্পনা। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সক্ষম না হওয়ার পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থের নয়ছয় হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত জলবায়ু সম্মেলন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ও দরিদ্র দেশগুলোর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে দেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।

গত শুক্রবার (১২ নভেম্বর) পর্দা নামে দুই সপ্তাহব্যাপী জলবায়ু সম্মেলন (কপ-২৬) সম্মেলনের। তবে অনেক দরকষাকষি ও দেন দরবারের পর শেষ সময়ে জলবায়ু অর্থায়নের বরাদ্দে গতি বেড়েছে। জলবায়ু মোকাবিলায় সাতটি খাতে ছোট ছোট অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে উন্নত দেশগুলো। এর আগে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে কার্বণ নিঃসরণের মাত্রা কতটা হবে এবং জলবায়ু সংকট সামাল দিতে অনুন্নত দেশগুলোকে কীভাবে কতটা সাহায্য করবে তা নিয়ে মতবিরোধ ছিল তুঙ্গে। এবারের গ্লাসগো জলবায়ু সম্মেলনে দরিদ্র দেশগুলোর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিসহ নানা দিক নিয়ে সংবাদ সারাবেলার সঙ্গে কথা বলেছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী অধ্যাপক এসআই খান, পরিবেশবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোকাদ্দেম হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মাকসুদ কামাল ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন- বাপা’র সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী অধ্যাপক এসআই খান বলেন, ‘এবারের জলবায়ু সম্মেলনে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তিই বেশি। প্রভাবশালী দেশগুলো মানতেই নারাজ যে তারা ক্ষতির জন্য দায়ী। তবে শেষ পর্যন্ত জলবায়ু ফান্ডে অর্থ দিতে রাজি হয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোর দাবি উপস্থাপন সঠিক ছিলো না। তাই কার্বন নি:সরণের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা ও সমস্যা সমাধানে বাস্তবসম্মত দাবি আদায়ের পরিবর্তে দরিদ্র দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ব্যাপারেই বেশি মনোযোগী ছিল, যা মোটেও কাম্য নয়। এতে সমাধান তো হবেই না, বরং লুটপাট বাড়বে। পরবর্তীতে ক্ষতিকর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। তখন ওই দেশগুলো বলবে আমরা তো ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়েছি ক্ষতির জন্য দরিদ্র দেশগুলোর দিকেই আঙুল তুলবে। এক্ষেত্রে জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় দেশে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদের যেসব প্রকল্প চলমান রয়েছে, সেগুলো শেষ করতে সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো দরকার ছিল। গরিব মানুষের মঙ্গল চিন্তা নয়, বরং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অসৎ উদ্দেশ্যে তারা টাকা আদায়ের চেষ্টা করেছে।’ তিনি জানান, জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিটি দরিদ্র দেশের স্বাবলম্বী হওয়া জরুরি। ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করে সাধারণ মানুষের আয়ের পথ সুগম করতে হবে।

পরিবেশবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোকাদ্দেম হোসেন জানান, এবারের সম্মেলনকে ‘গ্রিনওয়াশ ফেস্টিভাল’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন দেশের পরিবেশকর্মীরা। কারণ পরিবেশের ক্ষতির জন্য দায়ী ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে বাস্তবসম্মত দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্তরা, মিলেছে শুধু প্রতিশ্রুতি। জলবায়ু তহবিলের অর্থ অবমুক্তির জন্য প্রোজেক্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর অ্যাকশন প্লান আদায় করা সম্ভব হয়নি। তবে জলবায়ু ফান্ডে সআর্থিক সহায়তা, জিরো কার্বন নিঃসরণে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের যৌথ সম্মতি, কয়লার ব্যবহার কমানোর ব্যাপারে সম্মতি জানিয়েছে ওই দেশগুলো।

তবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে জলবায়ুর ফান্ডে ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থ পাওয়া যাবে- এ বিষয়কে ইতিবাচক মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মাকসুদ কামাল। কারণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দরিদ্র দেশগুলোর টাকার প্রয়োজন আছে। একই সঙ্গে ওই দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিশ্রুত টাকা সময়মতো আদায় এবং প্রাপ্ত অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন- বাপার সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল বলেছেন, ‘এবারের জলবায়ু সম্মেলনে সুদূরপ্রসারী গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত অর্জিত না হলেও, চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যাপারে বিশ্বনেতারা সংবদেনশীল হয়েছেন ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা, পৃথিবীব্যাপী বনাঞ্চল রক্ষাসহ ক্ষতিগ্রস্তদের দাবিগুলো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তবে কার্বন নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ি চীন ও ভারতের অংশগ্রহণ সন্তোষজনক ছিল না।’

সম্মেলনে জলবায়ু ও পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বড় বিতর্কের বিষয় হচ্ছে, কে বা কারা অধিক কার্বন নিঃসরণ ও জলবায়ুর ক্ষতির জন্য দায়ী। উন্নত দেশগুলো এজন্য হালের শিল্পোন্নত ও অধিক জনসংখ্যার দেশ চীন-ভারতকে দায়ী করে থাকে। তাদের যুক্তি এদের জনসংখ্যা বেশি, ভোগও বেশি সুতরাং এরাই পরিবেশ বিপর্যয়ে জন্য বেশি দায়ী।

অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বক্তব্য- শিল্প বিপ্লবের পর উন্নত দেশগুলো প্রচুর জ্বালানি ব্যবহার করে মুনাফার নামে পরিবেশ ও জলবায়ুর অধিক ক্ষতি করেছে এবং সে কাজটি করা হয়েছে কয়েকশ বছর ধরে তেল-গ্যাস-কয়লা পোড়ানোর মাধ্যমে। চীন-ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিল্পায়নের ইতিহাস ৫০-৬০ বছরের। পশ্চিমারা সে কাজ করে এসেছে ৩শ’-৪শ’ বছরের অধিক সময় ধরে। অতএব পরিবেশ বিপর্যয়ের দায় তাদেরই অধিক নিতে হবে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো পরিবেশ রক্ষার প্রবল চাপের মধ্যে পড়ে এখন শিল্পায়নে পিছিয়ে পড়ছে, আর্থিক দিক থেকে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রার ছকে রাখতে যে ক্ষতিপূরণ ও সহযোগিতার কথা ছিল তা করা হয়নি।

উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে, তখন পরিবেশ রক্ষার কথা বলে তাদের পিছনে ফেলার চেষ্টা চলছে। প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি বাণিজ্যে চাপে পড়াতে তারা জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা বলছে।

বাংলাদেশ এই ঝুঁকির তালিকায় থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকির সূচক ২০২১ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। জলবায়ুর পরিবর্তন জনিত দুর্যোগের ক্ষতির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাবে এর অবস্থান পঞ্চম। জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের উন্নয়নে ১২০ মিলিয়ন পাউন্ড ঘোষণা করেছে যুক্তরাজ্য। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বড় অর্থায়ন পেতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা করে তদবির করতে হবে।

এবারের সম্মেলনের সভাপতি ব্রিটিশ মন্ত্রী অলোক শর্মা বলেছেন, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সীমাবদ্ধ রাখতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। ২০১৫ সালে প্যারিসে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনার চুক্তি হয়েছিল। এবার বলা হচ্ছে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নামিয়ে আনার কথা। এ পরিকল্পনা সফল না হলে উষ্ণ তাপমাত্রায় সমুদ্রসীমা বেড়ে অনেক দেশ পানির নিচে তলিয়ে যাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে দরিদ্র দেশগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ধনী দেশগুলো। এজন্য যে অর্থ প্রয়োজন ছিল ধনী দেশগুলো তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে তারা এ দেশগুলোকে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যাতে তাদের পক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা সহজ হয়। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। কার্বন নিঃসরণের পূর্বের অঙ্গীকারও পূরণ হয়নি। সে জন্যই প্রশ্ন থেকে যায় ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের।