তাঁকে যেভাবে দেখেছি, যেমনটা জনেছি

ড. মোস্তাফিজুর রহমান: ড. শামসুল আলমের সাথে আমার পরিচয় একটি আলোচনা সভায় অংশগ্রহণের সূত্রে। প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনার অর্থনীতিবিদ প্যানেলের সদস্য হিসেবে ২০০৯ সালের কোনো একটি সময়ে পরিকল্পনা কমিশনের একটি মিটিং রুম তাঁর সাথে প্রথম দেখা। কমিটির চেয়ার অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন। সেদিনের পরে, অনেক সভা, বিশেষজ্ঞ কমিটি, সংলাপ ও টেলিভিশন প্রোগ্রাম অতিক্রম করে তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, যে সখ্যতা হয়েছে, যে নৈকট্যে পৌঁছেছে, তার অনেকটাই হয়েছে ড. শামসুল আলমেরই কারণে।

তাঁর ব্যক্তিত্বে এমন একটা প্রতিভাদীপ্ত খোলামেলা ভাব আছে এবং বুদ্ধিদীপ্ত সারল্যে আছে যা তাঁর সান্নিধ্যে যে আসে তাকেই তাঁর কাছে টানে। তাঁর শিক্ষক সত্তা এর পেছনে একটা বড় অনুঘটক বলে আমার মনে হয়েছে, কিন্তু তাঁর অন্তর্নিহিত ভালো মনের মানুষ সত্তাও যে তাঁকে, ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে, তাও বোধ হয় অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে আমার মতো সুহৃদের সংখ্যা তাঁর অনেক অনেক।

অধ্যাপক শামসুল আলমের অনেক গুণের মধ্যে একটি বড় গুণ হলো সবার সাথে কাজ করার এবং সবাইকে নিয়ে কাজ করার তাঁর সহজাত ক্ষমতা। পরিকল্পনা কমিশনে সিনিয়র সচিব হিসেবে দীর্ঘ বারো বছর ধরে নিরলস ও নিরবচ্ছিন্ন তিনি যে কাজ করে চলেছেন, তা প্রায় পুরোটাই বুদ্ধিবৃত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক বিদ্যায়তনিক জগতের কাজ এবং এ কাজ তাঁকে করতে হয়েছে অনেককে সঙ্গে নিয়ে। এ কাজ যাদের সম্পৃক্ত করে করতে হয়েছে তাদের একত্র করতে হলে, তাদের পরামর্শ নিতে হলে তাঁদের কাছ থেকে কাজ আদায় করতে হলে যিনি এর দায়িত্বপ্রাপ্ত তাকে যেমন একদিকে নিজেকে হতে হবে মেধাবী, অভিজ্ঞ, আত্মবিশ্বাসী, ঐকান্তিক ও উদ্যোগী, আবার অন্যদিকে যাদের সাথে নিয়ে কাজটি করতে হচ্ছে তাদের প্রতি হতে হবে শ্রদ্ধাশীল এবং তাদের মতামতের প্রতি মনোযোগী। আবার প্রয়োজনমাফিক নিজের মতামতকে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে উপস্থাপন করার সক্ষমতাও তাঁর থাকতে হবে। ড. শামসুল আলম এসব গুণেই গুণান্বিত পরিপূর্ণ একজন মানুষ।

তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, দুটি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান এমডিজি ও এসডিজি অনেক মূল্যায়ন প্রতিবেদনসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক পরিকল্পনা ও দলিলপত্র প্রস্তুতিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন গত এক যুগেরও অধিক সময়ে। আর তা সম্ভব হয়েছে তাঁর এসব গুণেরই সুবাদে। অর্থনীতির বিভিন্ন শাখায় ও ইস্যুতে তাঁর গভীর জ্ঞান, জানার আগ্রহ ও আমি বলবো নিখাঁদ দেশপ্রেমও এখানে বড় অবদান রেখেছে। যে কাজটি করছি তা যে দেশের উন্নতি ও আর্থসামাজিক কল্যাণের জন্য প্রয়োজন, এ বোধ কাজ না করলে বছরের পর বছর, এক কথায় নিরলস ও নিরবচ্ছিন্নভাবে লেগে থেকে এত কিছ কিছু করা সম্ভব নয় বলেই আমার মনে হয়। এসব গুরুত্বপূর্ণ দলিলের বেশ কয়েকটি প্রণয়নে সাথে আমি ব্যক্তিগতভাবে অর্থনীতিবিদ প্যানেলের ও উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে ড. শামসুল আলমের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। প্রায় সবগুলোরই সভাপতি হিসেবে পেয়েছি অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্যারকে। এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সভায় তিনি এসেছেন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে, সদস্যদের মন্তব্য-পরামর্শ শুনেছেন মনোযোগের সাথে, সদস্যদের ও সভাপতির বক্তব্য ও পরামর্শ যথাসম্ভব গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট দলিলে তার প্রতিফলন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাঁর একুশে পদকপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে ড. শামসুল আলমের কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের যখন স্বীকৃতি দেওয়া হলো তখন আর সবার সাথে আমিও আন্তরিকভাবে খুশি হয়েছি।

স্বল্প-মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রবৃদ্ধি, বণ্টন, বৈষম্য দূরীকরণ, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন, সামাজিক সুরক্ষা, উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা-বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে সুচিন্তিত বক্তব্য শুনতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সরকারের একজন সিনিয়র সচিব হিসেবে এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্তের সমর্থন প্রদানের একটা দায়বদ্ধতা তাঁর নিশ্চয়ই আছে। এবং সেটা বিশ্বাস থেকেই তিনি করেন। তবে একথা বললে সত্যের অপলাপ হবে যে সব সময় ড. শামসুল আলমের সব মন্তব্য ও মতামত, যুক্তি ও বিশ্লেষণের সাথে আমার মতের মিল হয়েছে। অর্থনীতি এমন একটি শাস্ত্র যেখানে তর্ক-বিতর্ক, যুক্তি-যুক্তি খণ্ডন-উল্টো যুক্তি উপস্থাপনের অবকাশ যেমন থাকে, গঠনমূলক সমালোচনার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাও আছে। তাঁর সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, আলোচনায়, টিভি প্রোগ্রামে দেখেছি, তিনি কোনো সময় যুক্তি খ-ন করেন, কোনো সময়ে আবার যুক্তি
মেনেও নেন, আবার কোনো সময় হয়তো আংশিকভাবে সহমত হন। অনেক ইস্যুতে, অনেক প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে তাঁর সাথে আমার এবং আমার মতো অনেকেরই অনেক সময় বিতর্ক হয়েছে, মতভিন্নতা হয়েছে, কিন্তু কখনো, আজ অব্দি, তার সাথে কোনো মনোমালিন্য হয়নি। বিষয়বস্তু নিয়ে মতভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু ভিন্ন মতাবলম্বীর সাথে ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, তিনি এ কথায় আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী একজন মানুষ। সমালোচনাকে তিনি কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখেন না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসব আমার পর্যবেক্ষণ। এমন একজন মানুষ সম্মান ও শ্রদ্ধা পাওয়ার ক্ষমতা ও যোগ্যতা রাখেন।

ড শামসুল আলমের প্রতি আমার ব্যক্তিগত ঋণের আরেকটি কারণ হলো, সিপিডির বিভিন্ন সংলাপে ও অনুষ্ঠানে যখনই তাকে অংশগ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, পূর্বনির্ধারিত কোনো ব্যস্ততা না থাকলে তিনি সব সময় তাতে সানন্দ সম্মতি দিয়েছেন, এসেছেন, র্দীঘ সময় থেকে অন্যদের বক্তব্য শুনেছেন। সময়-শৃঙ্খলা মেনে, আলোচ্য বিষয়ে তাঁর মূল্যবান বক্তব্য দিয়েছেন, আলোচনায় উথাপিত প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন যথাসম্ভব, নিজে কী নতুন জানলেন ও শিখলেন তাও বলেছেন। ‘প্রটোকল’ নিয়ে তিনি বিশেষ দুশ্চিন্তায় আছেন এ কথা কখনো মনে হয়নি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন দীর্ঘদিন হয়তো সে কারণেই। তার মতো মানুষের কাছে প্রকৃত অর্থেই অনেক কিছু জানার ও শেখার আছে। আমি সৌভাগ্যবান যে আমার সে সুযোগ হয়েছে।

ড. শামসুল আলম, আপনি দীর্ঘায়ু হোন, সুস্থ্য থাকুন, আরও অনেক বছর জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী কাজ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির আর্থসামাজিক কল্যাণে অবদান রেখে চলুন, এ কামনা করি অন্তরিকভাবে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান: সম্মানিত ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও প্রাক্তন অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।