মসনদ ফিরে পেতে বিএনপির নর্তন-কুর্দন

গোলাম মোস্তফা: সামনে নির্বাচন। গদিতে বসার মোহময় হাতছানি। একবার এই গদিতে বসতে পারলে ‘চৌদ্দগোষ্ঠির স্বর্গলাভ’। বসে খাওয়ার নিশ্চিত পুঁজি সঞ্চয়। বিনাপরিশ্রমে বিলিয়নিয়ার। তাই কিছুদিন শান্ত থাকার পর রাজনীতির মাঠ আবার ধীরে ধীরে গরম হচ্ছে। রাজনৈতিক খেলোয়াড়রা শীতনিদ্রা ছেড়ে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছেন। তাদের গদিতে বসার আর তর সইছে না। তাই বেড়ে গেছে কূটনৈতিকপাড়ায় তাদের যাতায়াত।

নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বড়ো দুই শাসকদলই এখন বাগযুদ্ধে লিপ্ত। তাদের এই বাগযুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে তখতে তাউসে আসীন হওয়া। বাংলাদেশে তখতে তাউসে বসার একমাত্র গণতন্ত্রসম্মত পথ ও পদ্ধতি অতি নিকটবর্তী। বিধি অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার কথা। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বক্তব্য হচ্ছে- সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক বা তথাকথিত নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আর কোনো জাতীয় নির্বাচন নয় এবং সে নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে পরপর দুটি জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় বিএনপি কোনোভাবেই আর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই আন্দোলনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতার মসনদে আরোহণের মনোবাঞ্ছায় সিরিজ বৈঠক করে দলের নেতাকর্মী এবং দলীয় সমর্থকদের মতামত নিয়েছেন। সেই সঙ্গে দল গোছাতে তারা কোমর বেঁধে উঠেপড়ে লেগেছেন। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন সরকারকে নানা হুমকি-ধমকি, বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে মাঠ গরমের চেষ্ট চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপির আন্দোলনের মূল ফোকাসই হলো- গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তারেক রহমানের সকল মামলা প্রত্যাহারসহ তার দেশে প্রত্যাবর্তনের সবরকমের বাধা অপসারণ। এর আগেও তারা ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি রক্ষায় রাজনৈতিক মাঠ গরমের চেষ্টা করেছিলেন। তখন হালে পানি পাননি বলে সে আন্দোলন আর এগোতে পারেনি। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রতিরোধে জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন দেশকে নরকে পরিণত করেছিল। সে কথা দেশের মানুষ ভুলে যায়নি। গত সাড়ে ১৩ বছরে গণবান্ধব কোনো কর্মসূচিই বিএনপি দেয়নি। জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়েই তাদের জোড়ালো কোনো বক্তব্য ছিল না। ছিল না জাতীয় বিষয়ে তেমন কোনো কর্মসূচি। বিএনপি কেবলই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দিয়েছে। এ কারণেই আজ তারা জনবিচ্ছিন্ন দলে পরিণত ।

দেশে মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটেছে। এখন তারা দেশ সম্পর্কে বেশ সচেতন। এই মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশই মনে করে- আওয়ামী লীগ বা মহাজোট যা করছে, বিএনপি বা তাদের জোটও ক্ষমতায় গিয়ে সেটাই করবে। বরং তারা আরও বেশি করবে বলেই তাদের ধারণা। তাই এই মধ্যবিত্ত এখন আর লুটপাট, দখলদারদের পালাবদলের নিয়ামক হতে চায় না। এই মধ্যবিত্ত এবং দেশের সাধারণ মানুষকে বিএনপি কোনো অবস্থাতেই আস্থায় আনতে পারেনি। বোঝাতে পারেনি বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশের পরিস্থিতি ভালো হবে; তাদের অবস্থার উন্নতি হবে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ছাড়া সাধারণ মানুষের নিত্যসমস্যা নিয়ে বিএনপির কোনো মরিয়া আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস নেই। তাদের চোখ শুধু ক্ষমতার মসনদের দিকে। এমন দলের জন্য দেশের সাধারণ মানুষ কেন বলির পাঁঠা হতে যাবে?

জনগণের সাড়া ব্যতীত বিএনপির পক্ষে দেশে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়- এটা ইতিহাস পরীক্ষিত সত্য। আওয়ামী লীগের শাসন থেকে পরিত্রাণ পেতে দেশের সাধারণ মানুষ তাদের আন্দোলন-সংগ্রামে জানপ্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে- ব্যাপারটা অত সহজ নয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেঁড়া গেঞ্জি এবং ভাঙা স্যুটকেসের যে নির্লোভ কাহিনী দেশের সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল, দুর্নীতিতে বারবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিএনপিই তা ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছে। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে বীতশ্রদ্ধ হয়েই সাধারণ মানুষ পাকিস্তানকে এ অঞ্চল থেকে তাড়িয়েছে। সেই স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের শাসনামলে স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে পতাকা ওড়াকে সাধারণ মানুষ কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। বিএনপির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এ দেশে মৌলবাদীদের এত আস্ফালন, এত হুমকি-ধমকি এবং ৬৩ জেলায় একসঙ্গে বোমার বিস্ফোরণের ঘটনা দেশের জনগণ ভালো চোখে দেখেনি। সারাদেশে ট্রাককে ট্রাক অস্ত্রের ধরা পড়াও ভুলে যায়নি এ দেশের মানুষ।

একটা বিষয় দেশের সচেতন মানুষের কাছে পরিষ্কার যে, বিএনপির আন্দোলন শুধু তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকার আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাদের লক্ষ্য যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করা; তাদেরকে রাজনীতিতে টিকিয়ে রাখা। তা না হলে বিএনপি এ দেশের মা-বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠনের সহায়তাকারীদের দোসর না হয়ে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করত অনেক আগেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বিএনপি প্রকাশ্যে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তারা আবার ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কী হবে, তা নিয়েও বিএনপি এখনো ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়েছে। দলটি জামায়াতের তোষামোদ করতে করতে নিজেরাই জনবিচ্ছিন্ন একটি সন্ত্রাসী দলের দিকে ভিড়ে যাচ্ছে।

রাজনীতির বিষয়ে মা নুষের মধ্যে ভিন্নমত ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই বলে দিনের বেলায় পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে একটা দলের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অপকৌশল দেশের বিবেকবান কোনো মানুষই মেনে নিতে পারে না। মেনে নেওয়া যায় না। তার ওপর ঘটনার সুষ্ঠু ও যুক্তিসঙ্গত তদন্ত এবং বিচার না করে জজ মিয়ার নাটক সাজানো দেশবাসীকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। বিবেকহীন পশুর বিচরণের জন্য তো মুক্তিযোদ্ধারা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে এ দেশ স্বাধীন করেনি?

গুম, খুন, অপহরণ, মতপ্রকাশে সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়া এবং ভোট চোর ও ভোট ডাকাত বলে বিএনপি এবং বিএনপি ঘরানার লোকজন এখন যতই গলা ফাটাক, ঢাকার রাজপথে যতই লাফালাফি করুক এবং কূটনীতিকদের কাছে হত্যা দিয়া যতই পড়ে থাকুক- তাদের শাসনামলের কর্মকাণ্ডের জন্যই জনগণ তাদের ডাকে আর সাড়া দেবে বলে মনে হয় না। দেশের জনগণ জনগণের জায়গাতেই এখন অনড় দাঁড়িয়ে আছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকবে বলেই মনে হয়।
দেশের সাধারণ মানুষ এখন ভোটের চেয়ে ভাতের সমাধান আগে দেখতে চায়। তারা চায় তাদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা। ভোটের অধিকার আদায়ের সাথে সাথে সাধারণ মানুষের আরও অনেক মৌলিক অধিকার আদায়ে তাদের রাজপথ কাঁপাতে হবে। তার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এক্ষেত্রে তাদেরকে প্রায়ই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। দিনে-রাতে, সকালে-বিকালে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে- এ নিয়ে তাদের তেমন কোনো মাথাব্যথা দেখা যায় না। তাদের নেই মানুষের সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা। আছে শুধু খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের মামলা থেকে অব্যাহতি। তাদের এসব কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে দেশের সাধারণ মানুষ আজ ত্যক্তবিরক্ত।

আওয়ামী লীগ গত সাড়ে ১৩ বছরে অনেক খারাপ কাজ করেছে, জনগণের মনোমতো অনেক কাজ করতে পারেনি- এ কথা যেমন সত্য; তেমনি বিএনপি নিকট অতীতে যে দুই দুইবার ক্ষমতায় ছিল, তখন দেশ ও জনগণের স্বার্থে তারা কী কী কাজ করেছিল বা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল? তেমন মাত্র পাঁচটি ইতিবাচক উদ্যোগের কথা কি তারা গর্ব করে বলতে পারবে?

আওয়ামী লীগ টানা সাড়ে ১৩ বছর দেশের শাসনক্ষমতায়। সরকারি দল আওয়ামী লীগ যা করেছে, যা করছে– তার অনেক কিছুই মেনে নেওয়ার মতো নয়। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা ভয়ানক আস্থার সংকটে আছে। দেশের অনেক উন্নয়ন-অগ্রগতি চর্মচক্ষে আজ দৃশ্যমান। বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশের মর্যাদা ক্রমবর্ধমান। নারীদের সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে সমানতালে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সত্যিই আজ গর্ব করার বিষয়। রাষ্ট্রের বর্তমান নীতিনির্ধারকরা জনগণকে নিম্ন থেকে মধ্যম এবং মধ্যম থেকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল, কক্সবাজারে টানেল নির্মাণসহ এ রকম আরও অনেক প্রকল্প অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া রোগীর মতো দেশের মানুষকে বেহুঁশ করে রেখেছে।

দেশ এগুচ্ছে, বিভিন্ন অবকাঠামো মাথা তুলে দাঁড়ােচ্ছে এটা যেমন ঠিক, তেমনি ঠিক- এ দেশে যেভাবে যখন-তখন জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, তা পৃথিবীর আর কোনো দেশে বাড়ে বলে জানা নেই। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও ব্যবসায়ীদের কাছে সরকারের নিধিরাম সরদারের ভূমিকা দেশবাসীকে চরম হতাশ করে। একটি সুস্থ্য-সুন্দর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে দেশের যতই উন্নয়ন-অগ্রগতি হোক, যতই চোখ ধাঁধানো অবকাঠামো গড়ে তোলা হোক- সকলই গরল ভেল।

প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে এখন দেশে বিএনপির অবস্থান কোথায়? কেবল ঘরোয়া বৈঠক ও বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে বিএনপি কি এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন করতে পারবে? গণ-অংশগ্রহণ ছাড়া গণ-আন্দোলন হয় না। এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটির প্রতি বিএনপির নেতৃত্বকে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। আন্দোলন যদি সত্যিকারেই জনসমর্থনপুষ্ট হয়, তা হলে সেই আন্দোলন দমন করতে পারে- এমন সাধ্য কার আছে?

‘দেশ বাঁচানো’, ‘গণতন্ত্র বাঁচানো’, ‘ভোটের অধিকার বাঁচানো’- এ জাতীয় বায়বীয় কথা না বলে, ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কী করবে তা কখনও পরিষ্কার করে বলছে না। রাজাকারদের কী হবে, দেশের উন্নয়নে বিএনপির ভূমিকা কী হবে- তাও দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। আওয়ামী লীগ গত সাড়ে ১৩ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে দুর্নীতি-লুটপাট করেছে, তা বন্ধ করে নতুনভাবে কোনো দুর্নীতি-লুটপাট করা হবে না, তেমন ওয়াদার কথাও তাদের মুখ থেকে শোনা যায় না। এ বাস্তবতায় দেশের সাধারণ মানুষ বিএনপির ফাঁকা বুলিতে নাচবে?

# এই লেখার মতামতের যাবতীয় দায় লেখকের।